পরিবারে এবং আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কীভাবে আমরা কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দেব
সালামুন আলাইকুম। আজকে আমাদের খুতবার বিষয়—পরিবারে এবং আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কীভাবে আমরা কুরআনের দাওয়াত পৌঁছে দেব, মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকব।
ঈমান ও সৎকর্ম: সৃষ্টির সেরা হওয়ার চাবিকাঠি
৯৮ নম্বর সূরা বাইয়িনার সাত নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: "ইন্নাল্লাজিনা আমানু ওয়া ‘আমিলুস সালিহাতি উলায়িকা হুম খইরুল বারিয়্যাহ"—নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও কর্মকে সংশোধন করেছে, তারাই সৃষ্টির সেরা।
কুরআনে অজস্র আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যারা ঈমান আনে ও কর্মকে করে, তারা সুনিশ্চিতভাবে জান্নাতে যাবে। ৪১ নম্বর সূরা ফুসসিলাত-এর ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: "ওয়ামান আহসানু কাওলান মিম্মান দা’ই ইলাল্লাহি ওয়া ‘আমিলা সালিহাওঁ ওয়া ক্বালা ইন্নানি মিনাল মুসলিমীন।"—সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, কর্মকে সংশোধন করে এবং বলে, “আমি মুসলিমদের মধ্য থেকে একজন।”
মুসলিম হওয়ার অর্থ
সূরা ফুসসিলাতের ৩৩ আয়াত আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করে—আমাদের অবশ্যই মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ আল্লাহ তাঁর রাসূলকেও দিয়েছেন।
২৭ নম্বর সূরা নামল-এর ৯১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাসূলকে বলছেন: —আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই। ৯২ নম্বর আয়াতে: "ওয়া আন আতলুয়াল কুরআন।"—আর যেন আমি কুরআন অধ্যয়ন করি।
আল্লাহর রাসূলেরও পরিচয় ছিল: তিনি মুসলিম।
দাওয়াত দেওয়ার ঝুঁকি ও প্রজ্ঞা
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যখন দাওয়াত দিতে যাই—আমাদের পরিবারে, আমাদের স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনকে—তখন কেন আমাদের সাথে তাদের ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়ে যায়? তিক্ততার সম্পর্ক শুরু হয়ে যায়, অনেক সময় হাতাহাতি-মারামারি পর্যায়ে চলে যায়। এর কারণ কী?
এর কারণ কিন্তু এই দুইটি আয়াতের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই। এক, সূরা নামল-এর ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাসূলকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন—"আমি যেন কুরআন অধ্যয়ন করি।"
সত্যি কথা বলতে দু:খজনক চরম বাস্তবতা হচ্ছে আমরা কুরআন অধ্যয়ন করি না।
সূরা মুহাম্মদ-এর ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন: —তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?
নবীদের দাওয়াত ও আমাদের দায়িত্ব
আমরা যখন দাওয়াত দিতে যাব, আমাদের প্রথমেই মনে রাখতে হবে—এই দাওয়াত দেওয়া তো নবীদের মতো কাজ; আর এই দাওয়াত দিতে গিয়ে, মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে গিয়ে, নবী-রাসুলরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নবী রাসূলদের মানুষ উন্মাদ বলত, পাগল বলত, মাথা খারাপ বলত, চর-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, মারধোর এসব তো ছিল প্রতিদিনকার মামুলি ঘটনার মতো। নুহ নবী সারে নয়শ বছর মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি তাঁর কওমের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। ঈসা নবীকে তো শুলেই চড়ালো, অনেক নবী রাসুলকে হত্যা পর্যন্ত তারা করেছে।
তাহলে ভাবুন, এটা কত বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ! কত বড় দুঃসাহসীক কাজ! মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, মারধরের ঝুঁকি আছে, চরথাপ্পড়-কিল- ঘুসি-পাগল ও উন্মাদ অপবাদের বোঝা মাথা পেতে নেয়ার ঝুঁকি আছে। এরপরও নবী রাসূলরা কি থেমে ছিলেন? থামেননি। কারণ—আল্লাহ্র দিকে ডাকার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ এই পৃথিবীতে আর কি হতে পারে? এর চেয়ে বড় তৃপ্তির কাজ আর কিইবা হতে পারে?
কুরআনের দাওয়াতের কৌশল
সূরা ফুরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেছেন এই কুরআন দিয়ে জিহাদ করার জন্য—এটা জিহাদে আকবার বা সবচেয়ে বড় জিহাদ। তো আল্লাহ্র রাসুল এই জিহাদ কিভাবে করেছেন কুরআন দিয়ে? তিনি কি কুরআন অস্ত্রের মতো রাইফেল বা তলোয়ারের মতো মানুষের মুখে ছুড়ে মারতেন? মারামারি করতেন? না! তিনি সুরা মুজাম্মিল অনুযায়ী রাতের অর্ধেক সময় ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে কুরআন পাঠ করতেন, সুরা মুহাম্মাদের ২৪ আয়াত অনুযায়ী কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা বা গবেষণা করতেন, সূরা নামলের ৯২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী কুরআন অধ্যয়ন করে বিভিন্ন প্রজ্ঞা অর্জন করতেন।
১. আপনি হয়তো হত্যার শিকারও হতে পারেন। অপবাদ তো খুবই মামুলি ব্যাপার—মারধর তো খুবই সাধারণ।
২. আপনাকে অবশ্যই প্রজ্ঞা অবলম্বন করতে হবে।
পরিবারে দাওয়াত দেওয়ার কৌশল
সূরা কাসাসের ৫৬ নম্বর আয়াত মাথায় রাখবেন: "নিশ্চয়ই তুমি যাকে ভালোবাসো, যাকে মহব্বত করো, (সেই প্রিয়জনকে) তুমি হেদায়েত দিতে পারবে না। বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হেদায়েত দান করেন। কারা হেদায়েত কবুল করবে তা তিনিই ভালো জানেন।"
এটাই হচ্ছে আপনার প্রথম প্রজ্ঞা: আল্লাহ্ বলছেন যাকে আপনি ভালবাসেন তাকে ইচ্ছে করলেই আপনি হেদায়াত দিতে পারবেন না। বরং এটা আল্লাহর হাতে। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করবেন তাকেই হেদায়াত দেবেন।
সূরা নামল (২৭ নম্বর সুরার)- ৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন: "তুমি অন্ধদের পথভ্রষ্টতা থেকে (হেদায়েতের দিকে) ফিরিয়ে আনতে পারবে না; তুমি শুধু তাদেরকে শোনাতে পারবে যারা আমার আয়াতে ঈমান আনে।"
সূরা বাকারা, ২৭২: "তাদেরকে (হেদায়েতের) সঠিক পথে নিয়ে আসা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তাকে (হেদায়েতের) সঠিক পথে পরিচালিত করেন।"
সূরা মায়েদার ৯২-৯৩ আয়াত পড়লে আমরা বুঝি যে আল্লাহর কুরআনের বাণী প্রচার ব্যতীত রাসুলের আর কোন দায়িত্ব নেই। রাসুলের দায়িত্ব শুধু আল্লাহ্র বানী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া।
সূরা ক্বাফের ৪৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন: ‘’তারা যা বলে তা আমি খুব ভালো করেই জানি। তুমি তাদের উপর জোর জবরদস্তিকারী নও। সুতরাং, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কুরআনের সাহায্যে উপদেশ দাও।‘’
সুরা ইউনুসের ৯৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন: “তোমার রব (আল্লাহ) যিদি চাইতেন তাহলে পৃথিবীর সকল মানুষ ঈমান আনতো। তবে কি তুমি মানুষের ওপর জোর জবরদস্তি করবে যাতে তারা ঈমান আনে?” সুরা বাকারার ২৫৬ আয়াতে আল্লাহ বলেন: ‘’লা ইকরাহা ফিদ-দ্বীন’’। দ্বিনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই।
দাওয়াতের সঠিক পদ্ধতি
২৬ নম্বর সূরা শুয়ারার ২১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: ‘’ আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করো’’ এরপর ২১৫, মানে পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘’ তুমি তাদের প্রতি বিনয়ী হও।‘’
তারপরের আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, ‘’তারপর যদি তারা তোমার অবাধ্য হয় তাহলে বলো ‘তোমরা যা করো নিশ্চয়ই আমি তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তার সঙ্গে আমি সম্পর্কহীন। তার জন্য আমি দায়ী নই।‘’
এর পরের আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন- ‘’ আর তুমি মহাপরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল কর। নির্ভর করো। ভরসা করো।‘’
সূরা লুকমানের ১৯ নম্বর আয়াতে: লুকমান তার সন্তানকে যখন প্রজ্ঞা শিক্ষা দিচ্ছেন, আল্লাহর হেদায়েতের বাণী শোনাচ্ছেন, কীভাবে ডেকেছিলেন? ‘’ইয়া বুনাইয়া’’ ওগো আমার প্রিয় পুত্র! এরকম দরদ মাখা সম্বোধন আপনাকে ব্যবহার করতে হবে।
সূরা হুজুরাতের ১১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলছেন—কাউকে কটাক্ষ করো না। কারো দিকে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করা, মন্দ বিশেষণে কাউকে ভূষিত করা—এটা ইসলামে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ।
সূরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৪-এ আমরা দেখি, আল্লাহ বলেন— "তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে।"
সূরা আনকাবূত, আয়াত ৪৬-এ আল্লাহ শেখাচ্ছেন: "তোমরা উত্তম পন্থা—মানে সৌজন্য ও চমৎকার যুক্তিপূর্ণ কথা —ছাড়া আহলে কিতাবের সঙ্গে বিতর্ক করবে না।"
প্রজ্ঞা বনাম জ্ঞান
অনেক সময় আমরা 'জ্ঞান' আর 'প্রজ্ঞা' গুলিয়ে ফেলি।
জ্ঞান কী? কোনো কিছু জানা, কোনো ইনফরমেশন কালেক্ট করা কোন তথ্য সংগ্রহ করা মানে জ্ঞান। আপনি নয়ের ঘরের নামতা জানেন—এটা জ্ঞান। আপনি সরল অঙ্ক জানেন—জ্ঞান। আপনি যোগ-বিয়োগ জানেন—এটা জ্ঞান। আপনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নাম জানেন— এটা জ্ঞান।
তাহলে প্রজ্ঞা কী? ধরুন আপনি গ্রামে গেলেন। দেখলেন—বর্ষাকাল, বিলে পানি জমেছে। কোথাও চার আঙুল পানি, কোথাও এক বিঘত, কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও গলা পর্যন্ত পানি। দুই বন্ধু, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি ছুটির পর গ্রামে যাচ্ছেন। পথে এই রকম পরিস্থিতি এলো। আপনারা ভাবলেন, "সারা জীবন তো এত গণিত শিখেছি—আজ একটু লাইফে এপ্লাই করি দেখি! বাস্তব জীবনে হাতে-কলমে প্রয়োগ করে দেখি!" তখন একটা ছোট কাঠি বা লাঠি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পানির গভীরতা মেপে গড় হিসেব বের করলেন। ধরুন গড় দাঁড়াল—হাঁটু পর্যন্ত পানি। এখন যদি আপনি প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত তুলে নেন আর রওনা দেন—আপনি কি পার হতে পারবেন? পারবেন না। কারণ যেখানে মাথার উপরে পানি—সেরকম জায়গায় যখন যাবেন, তখন ঠিকই ডুবে যাবেন, পুরো শরীর ভিজে যাবে। সুতরাং এই গল্প থেকে পরিষ্কার বুঝলেন যে স্কুল-কলেজে আপনি যে গড় অঙ্ক শিখেছেন, সেটি আপনি প্রজ্ঞার সাথে জীবনে প্রয়োগ করতে পারেননি।
পরিস্থিতি অনুযায়ী বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল প্রয়োগই হচ্ছে প্রজ্ঞা।
সংক্ষেপে শেখা কৌশলগুলো
- সূরা বায়্যিনাহ তে বলা হয়েছে: যারা ঈমান আনে ও কর্মকে সংশোধন করে, সৎকর্ম করে, তারা সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্বোত্তম।
- সূরা ফুসসিলাত (আয়াত ৩৩)-এ বলা হয়েছে: "সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কারও কথা হতে পারে না—যিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন, নিজের কর্মকে সংশোধন করেন, সৎ কাজ করেন, এবং বলেন—আমি মুসলিমদের একজন।"
- সূরা আন-নামল (আয়াত ৯১-৯২)-এ রাসূল বলেন: "আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন—আমি যেন মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই এবং কুরআন অধ্যয়ন করি।"
- সূরা তাহরীম (৬৬:৬)-এ আল্লাহ বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।"
- সূরা আশ-শুআরা (২৬:২১৪)-এ আল্লাহ বলেন: "তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দেরকে সতর্ক করো।"
- সূরা কাফ (৫০:৪৫)-এ আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেন: যে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও, কিন্তু কারো উপর জোর জবরদস্তি করো না।
- সূরা আশ-শুআরা (২৬:২১৫–২১৯): পরিবার-পরিজনের প্রতি বিনয়ী হতে হবে।
- সূরা লুকমান: কণ্ঠস্বর নিচু রাখতে হবে।
- সূরা হুজুরাত (১১): কাউকে কটাক্ষ করা যাবে না, দোষারোপ করা যাবে না।
- সূরা তোহা (২০:৪৪): "তোমরা ফিরআউনের সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে।"
- সূরা আনকাবুত (২৯:৪৬)-এ বলা হয়েছে: "তোমরা আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক করবে না—অত উত্তম পন্থা ও যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতি ছাড়া।"
আপনি যখন কুরআন অধ্যয়ন করবেন, তখন দেখবেন:
উপসংহার
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আজকে শেখা কৌশলগুলো নিজের ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক জীবনে, এবং সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন।
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল ‘আলামিন।
তাযকিয়া নফস